জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে জলবায়ু সতর্কতা: ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য ছাড়ালেও ফেরার পথ আছে

সূর্যালোকে বিস্তৃত সৌর প্যানেল—নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতীকী দৃশ্য
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতীকী ছবি 
ছবি: Samuel Faber/Pixabay (Pixabay Content License)।
নিজস্ব প্রতিবেদক।
প্রকাশিত:২১ অক্টোবর,২০২৬

জাতিসংঘ জলবায়ু প্রতিবেদন ২০২৬ নতুন করে সতর্ক করেছে, বিশ্বের উষ্ণায়নকে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্য আর অতিক্রম না করে অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে লক্ষ্যটি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছে না জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। দ্রুত ও গভীরভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো গেলে উষ্ণায়নের সর্বোচ্চ মাত্রা সীমিত করে শতকের শেষ নাগাদ তাপমাত্রা আবার ১.৫ ডিগ্রির কাছাকাছি বা নিচে নামানোর একটি কঠিন পথ এখনো খোলা আছে।

প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে

২১ অক্টোবর প্রকাশিত ইউএনইপির এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য পয়েন্ট অব রিটার্ন বলছে, সবচেয়ে আশাবাদী ১.৫ ডিগ্রি “ওভারশুট” পরিস্থিতিতেও বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শতকের মাঝামাঝি সময়ে ১.৭ থেকে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠতে পারে। এরপর নিঃসরণ কমানো এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি বা তার নিচে ফেরানোর সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে হিসাব করা হয়েছে।

এই পথের জন্য ২০২৫ সালের মাত্রাকে ভিত্তি ধরে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমাতে হবে। ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর ৫.৭ শতাংশ করে নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজন হবে। ইউএনইপির হিসাবে, দেশগুলোর বর্তমান জাতীয় জলবায়ু অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও ২০৩০ সালে নিঃসরণ কমবে মাত্র ৫–৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালে ১১–১৫ শতাংশ—প্রয়োজনীয় গতির তুলনায় যা অনেক কম।

বর্তমান নীতিতে উষ্ণায়ন কোথায় যেতে পারে

দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে একই ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তা ২.৮ ডিগ্রি পর্যন্ত যেতে পারে। আর নিঃসরণ আরও দ্রুত কমানোর নতুন পদক্ষেপ ছাড়া এসব প্রবণতা ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির তাপমাত্রা-লক্ষ্যের অনেক বাইরে থাকবে।

ইউএনইপি বলছে, গত বছরের তুলনায় পূর্বাভাস কিছুটা খারাপ হয়েছে। প্রতিবেদনে এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার এবং অতীতের নিঃসরণের সংশোধিত হিসাবকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নিঃসরণ বেড়েছে এমন দেশগুলোর মোট বৃদ্ধির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ-চাহিদা বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই তথ্য প্রতিবেদনের বৈশ্বিক হিসাবের একটি অংশ; একে কোনো এক দেশের একক দায় হিসেবে পড়া ঠিক হবে না।

লক্ষ্য ফেরানোর কঠিন শর্ত

তাপমাত্রা আবার নামাতে চলতি নিঃসরণ কমানোই যথেষ্ট হবে না। সবচেয়ে কম ও স্বল্পস্থায়ী উষ্ণায়ন-অতিক্রমের পরিস্থিতিতে এই শতকে বায়ুমণ্ডল থেকে আনুমানিক ৩২০ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে—পরিমাণটি ২০২৪ সালের বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় আট বছরের সমান। প্রযুক্তি, ব্যয় ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে এত বড় পরিসরে কার্বন অপসারণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। তাই কার্বন অপসারণকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

প্রতিবেদনটি শুধু ঝুঁকির কথাই বলেনি; নীতির কার্যকারিতার প্রমাণও তুলে ধরেছে। ২২০টির বেশি নীতি-মূল্যায়নে বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন জলবায়ু নীতির সঙ্গে গড়ে ৯ শতাংশ নিঃসরণ হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কার্বন কর ও নিঃসরণ-বাণিজ্যের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন খাতে ৫–১৩ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির দ্রুত বিস্তারও দেখায় যে, ধারাবাহিক নীতি ও বিনিয়োগ থাকলে জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা যায়। তবে এসব অগ্রগতি এখনো সব দেশ ও খাতে সমানভাবে ছড়ায়নি।

বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার মতো ঝুঁকি নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি। ইউএনইপির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য আলাদা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি; তাই নতুন সংখ্যাগত প্রভাবের দাবি করা ঠিক হবে না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যত বেশি এবং যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর চাপ তত বাড়বে—প্রতিবেদনের সামগ্রিক সতর্কতা এই দিকেই ইঙ্গিত করে।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, উষ্ণায়নের প্রতিটি অতিরিক্ত ভগ্নাংশ এবং ১.৫ ডিগ্রির ওপরে কাটানো প্রতিটি বছর বন্যা, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায়। এ বক্তব্য প্রতিবেদনের ঝুঁকি-সারাংশ, কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য আলাদা পূর্বাভাস নয়।

পরবর্তী নজর

প্রতিবেদনটির মূল বার্তা হলো-১.৫ ডিগ্রি সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি এখন বাস্তব, কিন্তু কতটা অতিক্রম হবে এবং কত দিন সেই মাত্রায় থাকবে, তা নীতিনির্ধারকদের বর্তমান সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের নির্গমন লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেশগুলো কী নতুন পদক্ষেপ নেয়, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কত দ্রুত বাড়ায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কতটা কমায়-এগুলোই এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।

তথ্যসূত্র