রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়াম: কবে থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম চালান
কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছেছে
পারমাণবিক জ্বালানির নতুন চালান

নিজস্ব প্রতিবেদক। 

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬

রূপপুরে পৌঁছাল প্রথম ইউনিটের বাড়তি ইউরেনিয়াম: কবে থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু?

পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে পারমাণবিক জ্বালানির নতুন চালান। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শুক্রবার রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর পর শনিবার সকালে ইউরেনিয়ামবাহী লরির বহর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগোল।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ইউরেনিয়াম চালান নয়। রূপপুরের প্রথম ইউনিটের মূল পারমাণবিক জ্বালানি ২০২৩ সালে বাংলাদেশে পৌঁছেছিল। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি লোডিং শুরু হয় এবং মে মাসে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনের কাজ শেষ হয়। এবারের চালানটি মূলত প্রথম ইউনিটের বাড়তি জ্বালানি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রয়োজন মেটানোর ধারাবাহিক সরবরাহের অংশ।

রূপপুরে ইউরেনিয়াম পৌঁছানোর নতুন চালান

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাশিয়া থেকে বিশেষ কার্গো বিমানে ইউরেনিয়ামের চালান শুক্রবার রাত প্রায় ১১টা ৪৪ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও নিরাপত্তা যাচাই শেষে শনিবার সকালে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় সড়কপথে রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।

সেনাবাহিনী, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন, পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা বহরটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন। যমুনা সেতু হয়ে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার দাশুড়িয়া অতিক্রম করে চালানটি রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত প্রয়োজন এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিংয়ের জন্য আরও কয়েকটি চালান আসবে। ডিসেম্বরের মধ্যে মোট একাধিক ফ্লাইটে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি দেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা এগিয়েছে?

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলোর একটি এসেছে সম্প্রতি। ইউনিটটির প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ ব্যবস্থার ১৬ মেগাপাসকেল উচ্চচাপের পরীক্ষা সফল হয়েছে।

এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভালভটি অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এর আগে ভালভের কারিগরি সমস্যার কারণে কমিশনিং কার্যক্রমে সাময়িক বিলম্ব হয়েছিল।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষার পরও প্রথম ইউনিটকে ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে নেওয়ার আগে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও যাচাই সম্পন্ন করতে হবে। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলে ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাওয়া হবে।

কবে থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ আসবে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রূপপুর থেকে কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে?

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, বাকি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সফলভাবে শেষ করা গেলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ২০২৬ সালের শেষ দিকে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। ফলে নির্দিষ্ট দিনে উৎপাদন শুরু হবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার আগে সব পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন শেষ হওয়া প্রয়োজন।

প্রথম পর্যায়ে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে না। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। পরবর্তীতে প্রথম ইউনিটের নির্ধারিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।

দুই ইউনিটে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।

এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাস, তেল ও অন্যান্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সামনে কী?

রূপপুরের প্রথম ইউনিট এখন কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পৌঁছানো, নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফল হওয়া এবং বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। তাই দ্রুত উৎপাদনের চেয়ে প্রতিটি পরীক্ষা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী সম্পন্ন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি, নির্মাণ অগ্রগতি ও বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে World Nuclear Association-এর তথ্য দেখতে পারেন



আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে


সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন


Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন