এলপিজির দাম ১,৮৩৭ টাকা, বাজারে ২,৩০০ কেন?

বাংলাদেশে এলপিজির দাম ও ১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের বাজারমূল্য
সরকার নির্ধারিত এলপিজির দাম ও বাজারমূল্যের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন।

নিজস্ব প্রতিবেদক।
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬

এলপিজির দাম ১,৮৩৭ টাকা, বাজারে ২,৩০০ কেন? সংকটের নেপথ্যে কী

ঢাকা, ২১ অক্টোবর ২০২৬: এলপিজির দাম সরকার নির্ধারণ করে দিলেও সাধারণ গ্রাহক সেই দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির বেসরকারি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। অথচ বাজারে একই সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের ২ হাজার ৩০০ টাকা বা তারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এতে রান্নার গ্যাসের বাড়তি ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

এলপিজির দাম ও বাজারমূল্যের পার্থক্য কত?

বিইআরসি গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

কিন্তু নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রেতাদের অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

অর্থাৎ, ১ হাজার ৮৩৭ টাকার নির্ধারিত দামের তুলনায় ২ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হলে একজন ক্রেতাকে অতিরিক্ত ৪৬৩ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এটি সরকারি দামের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

কেন সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না?

১. সরবরাহ সংকট ও পরিবেশকদের সমস্যা

বাজারে এলপিজির চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ না হলে খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে কিছু এলাকায় সরবরাহের ঘাটতি এবং ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

সরবরাহ সীমিত থাকলে ক্রেতাদের একাধিক দোকানে ঘুরতে হয়। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দেশের সব এলাকায় একই ধরনের সংকট রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।

২. আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয়

বাংলাদেশের বেসরকারি এলপিজি বাজার আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের মূল্য, জাহাজভাড়া, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক খরচের পরিবর্তন স্থানীয় মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।

বিইআরসির অক্টোবরের মূল্য সমন্বয়ে সৌদি আরামকোর গড় চুক্তিমূল্য এবং আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ব্যয় বৃদ্ধি হলেই খুচরা বাজারে যেকোনো অতিরিক্ত দাম নেওয়া ন্যায্য হয়ে যায় না।

৩. কোম্পানি ও পরিবেশকদের কমিশন নিয়ে বিরোধ

এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আমদানি, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, পরিবহন, অর্থায়ন ও সিলিন্ডার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বেড়েছে। এসব খরচের পাশাপাশি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু কোম্পানির প্রস্তাবিত ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতার কাছ থেকে বাস্তবে নেওয়া বাড়তি দামের মধ্যে কতটা সম্পর্ক রয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। এ জন্য সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের হিসাব প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।

২৯ অক্টোবর বিইআরসির গণশুনানি

এলপিজির মূল্য নির্ধারণ, সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের ব্যয় এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন নিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করার কথা রয়েছে বিইআরসির। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এই শুনানিতে কোম্পানিগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির দাবি, কমিশন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব এবং ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে গণশুনানি হওয়া মানেই এলপিজির দাম আবার বাড়বে, এমন নয়। শুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তি পর্যালোচনা করে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

ভোক্তারা কী করবেন?

এলপিজি কেনার সময় ক্রেতাদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত।

  • সিলিন্ডারের ওজন ও নির্ধারিত মূল্য যাচাই করুন।
  • সম্ভব হলে কেনার রসিদ সংগ্রহ করুন।
  • অতিরিক্ত দাম নেওয়া হলে বিক্রেতার নাম, ঠিকানা ও মূল্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করুন।
  • অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যোগাযোগ করুন।

সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি জরুরি।

উপসংহার

এলপিজির দাম নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত হয় না। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, আমদানি ও বিতরণব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা এবং খুচরা বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২৯ অক্টোবরের গণশুনানিতে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর সাধারণ ভোক্তাদের।

তথ্যসূত্র


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে

সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন

Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন