৫ বছরের মধ্যে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী

Solar Irrigation Pumps for Farmers in Bangladesh

৫ বছরের মধ্যে কৃষকদের Solar Irrigation Pumps বা সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনা

Solar Irrigation Pumps বা সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়িয়ে দেশের কৃষি সেচ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ডিজেলচালিত পানির পাম্পগুলোকে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে কৃষকের সেচ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ডিজেলের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ পরিকল্পনার কথা জানান। সংসদে তিনি বলেন, দেশের যেসব এলাকায় বর্তমানে ডিজেল ব্যবহার করে পানির পাম্প চালানো হয়, সেসব পাম্প ধাপে ধাপে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজেলের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ

কৃষি উৎপাদনে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে নিয়মিত পানি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। দেশের অনেক কৃষক দীর্ঘদিন ধরে সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়ে।

সংসদে তাজউদ্দীন খান জানতে চান, ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের পরিবর্তে কৃষকদের সেচের জন্য বিনামূল্যে সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে ডিজেলচালিত পানির পাম্পগুলো পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষকের জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পাম্প চালানোর ফলে নিয়মিত ডিজেল কেনার প্রয়োজন অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

কৃষকের সেচ ব্যয়ে সম্ভাব্য স্বস্তি

সেচের ব্যয় কৃষকের মোট উৎপাদন খরচের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিজেলের মূল্য, পাম্প পরিচালনা, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মিলিয়ে সেচ মৌসুমে কৃষকের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়।

সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুরুতে প্যানেল, পাম্প, ইনভার্টার ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারি স্থাপনে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তবে ব্যবস্থা স্থাপনের পর সূর্যের আলো বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি কেনার ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ সীমিত অথবা ডিজেল পরিবহন ব্যয় বেশি, সেখানে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা কৃষকদের জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের বড় লক্ষ্য

কৃষি সেচে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ সরকারের বৃহত্তর নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ। সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো অন্যান্য প্রযুক্তি থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

রুফটপ সোলারেও বাড়ছে সরকারি উৎসাহ

কৃষি সেচের পাশাপাশি বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে নির্ধারিত হারে মূল্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর জারি করা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রণোদনার আওতায় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য নির্ধারণের কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়।

লিথিয়াম ব্যাটারিতে জোর

সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারি প্রযুক্তির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে তিনি জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লেড ও লিথিয়াম—দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়।

সরকার লিথিয়াম ব্যাটারি প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করতে চায়। দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

লেড ব্যাটারিতে ব্যবহৃত অ্যাসিড পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আরও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রী জানান। বিশেষ করে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে লিথিয়াম ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুতে বড় সম্প্রসারণ

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎকে অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ছাদ ও খোলা জমির পাশাপাশি ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষির সঙ্গে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।

কৃষিজমির ব্যবহার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই জায়গায় কৃষি উৎপাদন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সম্ভাবনা থাকবে।

সৌর সেচে বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জও রয়েছে

তবে ডিজেলচালিত সব সেচ পাম্পকে পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। বিপুলসংখ্যক পাম্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, সৌর প্যানেল, পাম্প, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া প্রত্যন্ত কৃষি এলাকায় যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ও প্রতিস্থাপন ব্যয়ও প্রকল্প পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশে প্রায় ৫১ হাজার ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের তথ্যও উঠে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ওপর থাকার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের সেচ খাতে সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। একটি গবেষণায় সৌরভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং ডিজেল নির্ভরতা কমানোর সুযোগ দেখানো হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা

কৃষি সেচে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুধু কৃষকের খরচ কমানোর বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ডিজেলের ব্যবহার কমলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হওয়ায় পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশ তিনটি খাতেই এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পগুলো পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এখন এই পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কোন অঞ্চলে আগে কাজ শুরু হবে এবং কৃষকরা কী ধরনের আর্থিক ও কারিগরি সুবিধা পাবেন এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের কৃষি সেচ ব্যবস্থায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। ডিজেলের পরিবর্তে সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেচ পরিচালনার মাধ্যমে কৃষকের ব্যয় কমানো, জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে, কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, মানসম্মত যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর।

Follow us on Facebook

আরো পড়ুন-

সংসদে বর্তমান মাথাপিছু ঋণের হিসাব দিলেন অর্থমন্ত্রী।