অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত চলার মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ। বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি।

সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের মেয়াদে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যনীতি, রোগ প্রতিরোধ, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে কাজ করার কথা ছিল তাঁর।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া এবং বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ। সায়মা ওয়াজেদ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্তের মধ্যেই পদত্যাগ

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান ও তদন্তের বিষয়টি সামনে আসে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ডব্লিউএইচওর দায়িত্ব থেকে অবৈতনিক প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়।

এরপর দীর্ঘ সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর পদত্যাগপত্রে উঠে এসেছে।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ অভিযোগ করেন, দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই তিনি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দায়িত্ব পালনে তিনি আন্তরিক ছিলেন।

চীন সফরের অর্থ নিয়ে অভিযোগ

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যতম অভিযোগ চীন সফরের ব্যয়সংক্রান্ত। ডব্লিউএইচওর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে তাঁর আইনজীবীরা জানান, সফর ব্যয়ের অর্থ ফেরত পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল।

ওই ঘটনায় প্রায় ৯০১ মার্কিন ডলারের অর্থের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সায়মা ওয়াজেদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি কোনো ইচ্ছাকৃত আর্থিক প্রতারণা বা জালিয়াতির ঘটনা নয়।

তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত ভ্রমণ ব্যয় ফেরত পাওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ভুলের কারণেই ওই অর্থসংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি হয়। সায়মা ওয়াজেদও এ অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সায়মার বক্তব্য

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন।

তিনি দাবি করেছেন, এই ডিগ্রির প্রকৃতি সম্পর্কে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসকে তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মিথ্যা তথ্য তিনি দেননি। এ অভিযোগের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন।

জমি অধিগ্রহণ নিয়েও অভিযোগ

বাংলাদেশে একটি জমির প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে রয়েছে। তবে এ অভিযোগের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ডব্লিউএইচওতে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ওই জমি তাঁর মালিকানায় এসেছিল।

তাঁর দাবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনি ব্যবস্থার আওতায় তিনি ওই জমির অধিকার পেয়েছিলেন।

ফলে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক হওয়ার পর ওই জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।

দীর্ঘদিন অবৈতনিক ছুটিতে ছিলেন

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের আগে তিনি দীর্ঘ সময় অবৈতনিক ছুটিতে ছিলেন। অভিযোগের তদন্তের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ছুটিতে পাঠানো হয়।

পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘ সময় কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ার কারণে তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বাধার অভিযোগও করেন তিনি।

তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

ডব্লিউএইচওর গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন সায়মা

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি ডব্লিউএইচওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নেতৃত্বের দায়িত্ব। এ অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয় করা, রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে সহযোগিতা এবং স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আঞ্চলিক পরিচালক।

২০২৩ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যদেশগুলোর ভোটে সায়মা ওয়াজেদ আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হন। পরের বছর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর মেয়াদ পাঁচ বছরের হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই পদত্যাগের মাধ্যমে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব

সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত ও মামলা শুরু হয়।

সেই সময় সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধানের খবর প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউএইচও তাঁকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়।

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগ এবং ডব্লিউএইচওতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি নিজেই একাধিকবার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের পর এখন ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন, প্রার্থী যাচাই এবং ভোটের মতো কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হবে।

এই পদটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অঞ্চলে জনসংখ্যা বেশি এবং সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু, অসংক্রামক রোগ এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

নতুন আঞ্চলিক পরিচালকের অন্যতম দায়িত্ব হবে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে পদত্যাগ এক বিষয় নয়

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা এবং সেই অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।

সায়মা ওয়াজেদ নিজে চীন সফরের অর্থসংক্রান্ত অভিযোগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।

তাই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের ফলে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটল। এখন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য অঙ্গনের নজর থাকবে নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগগুলোর পরবর্তী অগ্রগতির দিকে।


Follow us on Facebook

আরো পড়ুন-

সংসদে বর্তমান মাথাপিছুঋণের হিসাব দিলেন অর্থমন্ত্রী।