আপনার প্লেটের ভাত কতটা নিরাপদ? চালে আর্সেনিক নিয়ে নতুন গবেষণা

বাংলাদেশে চালে আর্সেনিক ও ভাতের খাদ্য নিরাপত্তা
চালে অজৈব আর্সেনিকের উপস্থিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আপনার প্লেটের ভাত কতটা নিরাপদ? চালে আর্সেনিক নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল

চালে আর্সেনিক নিয়ে নতুন গবেষণায় বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের প্রধান খাদ্য চালের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১০৪টি চালের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি নমুনায় অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা আন্তর্জাতিক খাদ্যমান নির্ধারণকারী সংস্থা Codex Alimentarius-এর নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা একই সঙ্গে জানিয়েছেন, অধিকাংশ নমুনাই নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল এবং এই প্রাথমিক গবেষণার ফল দেখে চাল খাওয়া বন্ধ করার কোনো কারণ নেই।

১০৪টি চালের নমুনায় কী পাওয়া গেল?

সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের আটটি বিভাগের ১৭টি বাজার থেকে ১০৪টি বাণিজ্যিক চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনায় ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং ধান চাষে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের পাশাপাশি অজৈব আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ১০৪টি নমুনার মধ্যে ১৯টিতে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.২ মিলিগ্রামের আন্তর্জাতিক সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৮ শতাংশ নমুনায় নির্ধারিত সীমার বেশি আর্সেনিক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রায় ৮২ শতাংশ নমুনায় অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা ওই সীমার মধ্যে ছিল।

আর্সেনিক কেন চালের জন্য উদ্বেগের বিষয়?

বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলের মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক রয়েছে। কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করার সময় সেই আর্সেনিক ধানের জমিতে পৌঁছাতে পারে। ধানগাছ মাটি ও সেচের পানি থেকে বিভিন্ন উপাদান শোষণ করে এবং এর একটি অংশ ধানের শস্যেও পৌঁছাতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় আর্সেনিকের সংস্পর্শে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে খাদ্যশস্যে অজৈব আর্সেনিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো একটি চালের নমুনায় আর্সেনিক পাওয়া গেলেই সেটিকে সরাসরি বিপজ্জনক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে আর্সেনিকের মাত্রা, প্রতিদিন কত পরিমাণ চাল খাওয়া হচ্ছে, কত বছর ধরে খাওয়া হচ্ছে এবং পানি ও অন্যান্য খাদ্য থেকে একই ধরনের দূষকের সংস্পর্শ কতটা হচ্ছে এসব বিষয়ের ওপর।

চালে আর্সেনিক নিয়ে গবেষকরা কী বলছেন?

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি প্রাথমিক গবেষণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, মাত্র ১০৪টি নমুনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সব বাজার, সব ধরনের চাল, সব উৎপাদন এলাকা কিংবা সব মৌসুমের চাল সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গবেষকদের পরামর্শ হলো, বিষয়টি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে নিয়মিত পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ এবং আরও বড় পরিসরে গবেষণা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোন অঞ্চল, কোন জাতের চাল অথবা কোন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি সম্পর্কিত তা খুঁজে বের করা জরুরি।

শুধু আর্সেনিক নয়, অন্য দূষকও পরীক্ষা হয়েছে

গবেষণায় শুধু আর্সেনিক নয়, ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং ২২ ধরনের নির্বাচিত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশও পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব পরীক্ষায় ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং পরীক্ষা করা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল।

এ কারণে গবেষণার সামগ্রিক চিত্রকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না গবেষকরা। বরং অজৈব আর্সেনিকের কয়েকটি নমুনায় সীমা অতিক্রমের বিষয়টিকে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রান্নার পর চালের উপাদান কি বদলে যায়?

চাল নিয়ে সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণাতেও রান্নার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় ১০৬টি কাঁচা চাল, রান্না করা চাল এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, রান্নার পর চালের কিছু উপাদানের মাত্রা কমে এবং কিছু উপাদানের মাত্রা বাড়ে। অর্থাৎ কাঁচা চাল পরীক্ষা করলেই রান্নার পর মানুষ আসলে কতটা উপাদানের সংস্পর্শে আসছে তা সবসময় পুরোপুরি বোঝা যায় না। গবেষকরা তাই খাদ্য পরীক্ষা করার পাশাপাশি মানবদেহে উপাদানের উপস্থিতি বোঝার জন্য বায়োমনিটরিংয়ের গুরুত্বের কথাও বলেছেন।

তাহলে কি ভাত খাওয়া বন্ধ করতে হবে?

না। বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে ভাত খাওয়া বন্ধ করার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ দেখানো হয়নি। বরং গবেষকদের বক্তব্য হলো, ১০৪টি নমুনার মধ্যে অধিকাংশ নমুনায় অজৈব আর্সেনিক নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল।

বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় চালের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই চাল বাদ দেওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নিয়মিত পরীক্ষা এবং নজরদারি জোরদার করাই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও গুজবের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত। কোনো নির্দিষ্ট চালের ব্র্যান্ড বা জাতকে শুধু একটি প্রাথমিক গবেষণার ফলের ভিত্তিতে নিরাপদ বা অনিরাপদ ঘোষণা করাও ঠিক হবে না।

সামনে কী করা প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বড় জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন। বিভিন্ন অঞ্চল, মৌসুম এবং চালের জাতভেদে আলাদা করে নমুনা পরীক্ষা করা যেতে পারে। যেসব নমুনায় তুলনামূলক বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়, সেগুলোর উৎসও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি কম আর্সেনিক শোষণকারী ধানের জাত, নিরাপদ সেচব্যবস্থা এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।

আতঙ্ক নয়, দরকার নিয়মিত পরীক্ষা

চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের খাবারের অন্যতম প্রধান অংশ। তাই চালে আর্সেনিক নিয়ে নতুন গবেষণার তথ্যকে আতঙ্ক তৈরির কারণ হিসেবে না দেখে সতর্কতার বার্তা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

সাম্প্রতিক গবেষণায় ১০৪টি নমুনার মধ্যে ১৯টিতে নির্ধারিত সীমার বেশি অজৈব আর্সেনিক পাওয়া গেছে এটি অবশ্যই নজর দেওয়ার মতো তথ্য। তবে একই গবেষণা এটাও দেখিয়েছে যে অধিকাংশ নমুনা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল। ফলে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন হলো বড় পরিসরে গবেষণা, নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা।

ভাতের প্লেট তাই আতঙ্কের নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও নিয়মিত নজরদারির বিষয়।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরির গবেষণার বিষয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশে কাঁচা ও রান্না করা চাল নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা।


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে


সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন


Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন