শুধু ইরানের নয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পুরো মুসলিম উম্মাহর শত্রু: মোজতবা খামেনি

Mojtaba Khamenei Iran US Israel conflict
মোজতবা আলী খামেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২৬

শুধু ইরানের নয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পুরো মুসলিম উম্মাহর শত্রু: মোজতবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শুধু ইরান বা ইরানের জনগণের বিরোধী নয়, বরং তাদের অবস্থান পুরো মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের বিরুদ্ধে। মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সরকার ও জনগণকে নিজেদের প্রকৃত শত্রু সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রোববার (৩০ আগস্ট) মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় মোজতবা খামেনি এসব মন্তব্য করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

মুসলিম ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ

বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের নানা সংকট ও সমস্যার সমাধানের জন্য অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ, পারস্পরিক বন্ধুত্ব, ন্যায়বিচার, কল্যাণ এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তবে তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান, ইরানি জনগণ কিংবা ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরোধী নয়। তাদের বিরোধিতা পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোসহ বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—এমন দেশগুলোর সরকারও বিভিন্ন সময় আধিপত্যবাদী শক্তির চাপ, অসম্মান ও রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।

মুসলিম বিশ্বে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ

মোজতবা খামেনি মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভেদকে শত্রুদের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ধর্মীয় ও মতাদর্শগত পার্থক্যের পাশাপাশি জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে ব্যবহার করে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে তাদের সম্মিলিত শক্তি দুর্বল করা এবং পরে সুযোগ বুঝে তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই প্রতিপক্ষের অন্যতম লক্ষ্য।

মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ বা বিভাজন তৈরি করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকেও সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জেনে কিংবা না জেনে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরির উদ্যোগ নিলে তা শেষ পর্যন্ত ইসলামবিরোধী শক্তির স্বার্থকে এগিয়ে নিতে পারে।

খামেনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে কেবল অজ্ঞতা বা অসতর্কতা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। তার দাবি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলো এখন তাদের আধিপত্যবাদী ও ঔপনিবেশিক লক্ষ্য অনেক বেশি প্রকাশ্যে এগিয়ে নিচ্ছে।

ফিলিস্তিন ও পারস্য উপসাগর প্রসঙ্গ

মুসলিম দেশগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণের আহ্বান জানিয়ে খামেনি ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন করেন, মুসলিম বিশ্ব যদি আরও ঐক্যবদ্ধ থাকত, তাহলে ফিলিস্তিনি জনগণ কি দখলদারদের নিপীড়ন ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সামনে এতটা অসহায় অবস্থায় থাকত?

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল নিয়েও তিনি মুসলিম দেশগুলোর প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তার মতে, এই অঞ্চলের জনগণ ও সরকারগুলো যদি ইসলামি ঐক্যের ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত, তাহলে দূরবর্তী কোনো শক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে তাদের ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আগ্রহ দেখানো কঠিন হতো।

মুসলমানদের জন্য তিনটি করণীয়

মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুসরণের কথা বলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

প্রথমত, মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে এবং বিভেদ এড়িয়ে চলতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবিশ্বাস, হুমকি ও আগ্রাসনের মুখে একে অন্যের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় সহযোগিতা করতে হবে। তৃতীয়ত, জ্ঞান, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সম্পদ, উন্নয়ন এবং আধ্যাত্মিক অগ্রগতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

খামেনির মতে, মুসলমানদের ঐক্য একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ ইসলামি সভ্যতা গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তার দাবি, মুসলিম বিশ্ব যদি পারস্পরিক বিভেদ ভুলে অভিন্ন স্বার্থ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তাহলে একটি নতুন ও শক্তিশালী ইসলামি সভ্যতা গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের আহ্বান

মোজতবা খামেনির বক্তব্যে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানো হলে মুসলিম দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে। তার মতে, বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন সংকটে পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন এবং মানবিক সহায়তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। মুসলিম ঐক্যকে তিনি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরেন।


Follow us on Facebook

আরো পড়ুন-

সংসদে বর্তমান মাথাপিছু ঋণের হিসাব দিলেন অর্থমন্ত্রী।