হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বাংলাদেশে হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশু, Measles Outbreak Bangladesh
ডেঙ্গুর পর এবার হাম: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

ডেঙ্গুর পর এবার হাম, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডেঙ্গুর উদ্বেগের মধ্যেই বাংলাদেশে আবারও Measles In Bangladesh পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে সন্দেহজনক হামের এক হাজার ২২১টি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৮৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী,গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৩ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ৯৬২ জন।

২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে যে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে,তাদের মধ্যে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে দুজন করে এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে একজন করে রয়েছে।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। ছয়টি মৃত্যুকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সন্দেহজনক বা হামের উপসর্গজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ,হামের উপসর্গ থাকা সব মৃত্যুকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম হিসেবে গণ্য করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে নিশ্চিত এবং সন্দেহজনক মৃত্যুর হিসাব আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম পরিস্থিতি

দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে,গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ২২১ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৮৪ জনের শরীরে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮১ হাজার ৩৫ জন। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ২০ হাজার ৬৪৬ জন।
এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৫৯ হাজার ৮০৪ জন। তাদের মধ্যে এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৪৮ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে,দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে আসছেন। ফলে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

কেন শিশুদের নিয়ে বেশি উদ্বেগ?

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বর,কাশি,সর্দি,চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া হামের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলেই সেটিকে নিশ্চিত হাম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুর এমন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।

UNICEF Bangladesh — Measles-Rubella Vaccination

টিকাদান কার্যক্রম কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হাম প্রতিরোধে টিকাদান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে আগের টিকাদান কার্যক্রমের পরও যেসব শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নতুন করে হামবিরোধী টিকাদান কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অভিভাবকদের কী করণীয়?

শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে একই এলাকায় হাম বা হামের উপসর্গের রোগী থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা,চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো এবং পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি হতে পারে। তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে দেওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে কি না,তা যাচাই করা। টিকা না পাওয়া বা কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় জেনে নেওয়া উচিত।

ডেঙ্গুর সঙ্গে নতুন করে হামের চাপ

বাংলাদেশে একই সময়ে ডেঙ্গু ও হাম দুই স্বাস্থ্যঝুঁকির খবর সামনে আসায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ডেঙ্গুতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং মৃত্যুর খবরও আসছে। এর মধ্যেই শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ ও মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তবে ডেঙ্গু ও হাম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রোগ। ডেঙ্গু মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ,আর হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। তাই দুই রোগ প্রতিরোধের পদ্ধতিও আলাদা।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে হাম পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে নতুন রোগী,নিশ্চিত রোগী,হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হাম-সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। ফলে শিশুদের সুরক্ষা,টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী,আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা,শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা এবং হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন তথ্য প্রকাশ হলে বর্তমান হিসাবও পরিবর্তিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন,বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।

Follow us on Facebook

আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে

Our YouTube Channel