ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: ১০০ ডলার ছাড়াল তেলের দাম, বাড়ছে বিশ্ববাজারের উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ১০০ ডলার ছাড়ানো তেলের দাম
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও তেলের দাম

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: ১০০ ডলার ছাড়াল জালানি তেলের দাম

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলা, জাহাজ চলাচলে বাধা এবং তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। সর্বশেষ বাজার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক Brent crude এর দাম ১০৮ ডলারের কাছাকাছি এবং যুক্তরাষ্ট্রের West Texas Intermediate (WTI) ১০৩ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কেন বাড়ছে জালানি  তেলের দাম ?

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথগুলোতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার ভয় থেকেই তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।

Reuters-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় Brent crude-এর দাম শুক্রবার এশীয় বাণিজ্যে প্রায় ১০৮.৯৬ ডলারে উঠেছিল। একই সময়ে বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতাও বেড়েছে

হরমুজ প্রণালিতে তীব্র হচ্ছে উদ্বেগ

বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক বেশি। এই পথে তেল ও গ্যাস পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে শুধু তেল নয়, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে হরমুজ অঞ্চলে ট্যাংকার হামলা এবং জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের মক্কা বন্দর দখল এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার ঘটনাও বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে

হরমুজ প্রণালিতে তীব্র হচ্ছে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালিতে তীব্র হচ্ছে উদ্বেগ

আরো দেখুন-

ইরানের সারপ্রাইজ অ্যাটাক! বিপর্যস্ত মার্কিন বাহিনী


১০০ ডলার ছাড়িয়েছে Brent ও WTI

সাম্প্রতিক উত্থানে Brent crude-এর দাম ১০০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করেছে। ১১ সেপ্টেম্বরের বাজারে Brent প্রায় ১০৮ ডলারের কাছাকাছি এবং WTI ১০৩ ডলারের ওপরে ছিল। Reuters জানিয়েছে, সপ্তাহ শেষে উভয় প্রধান বেঞ্চমার্কই চার মাসের মধ্যে প্রথমবার ১০০ ডলারের ওপরে থাকার পথে রয়েছে। সপ্তাহজুড়ে দুই ধরনের তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে।

এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর Brent crude ১০১.২১ ডলারে লেনদেন শেষ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতিই তখনও দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে জালানি সংকট

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতার খবর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে। The Business Standard  জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ও ইরানের ওপর নতুন করে চাপ বৃদ্ধির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারে আন্তর্জাতিক তেলের দামের দীর্ঘস্থায়ী ঊর্ধ্বগতি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি বা পরিবহন ব্যয় একই হারে বাড়বে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সরকারি মূল্য নির্ধারণ, আমদানি চুক্তি, মজুত এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারসহ বিভিন্ন বিষয় এর ওপর প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব কি হতে পারে?

তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে বিমান পরিবহন, নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

এদিকে উচ্চ জ্বালানি মূল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে উচ্চ তেলের দাম সুদের হার সংক্রান্ত নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বশেষ বাজার প্রতিবেদনে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশা বৃদ্ধির কথাও উঠে এসেছে।

হরমুজ প্রণালিতে তীব্র হচ্ছে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালিতে তীব্র হচ্ছে উদ্বেগ

সংঘাত দীর্ঘ হলে আরও বাড়তে পারে জালানি ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ এখন সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন কতটা স্বাভাবিক রাখা যায়। যদি হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে দীর্ঘ সময় বাধা থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট আরও গভীর হতে পারে।

অন্যদিকে সংঘাত দ্রুত কমে এলে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে তেলের বাজারে চাপ কিছুটা কমার সুযোগ রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সামরিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তাই তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সামনে কী হতে পারে জালানি পরিস্থিতি?

বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও বাড়লে তেলের দাম নতুন উচ্চতায় যেতে পারে এমন আশঙ্কা বাজারে রয়েছে। আবার কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হলে দ্রুত দাম কমেও আসতে পারে।

বিশ্ববাজারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শুধু তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে কি না, বরং এই উচ্চ মূল্য কতদিন স্থায়ী হয়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপ আরও বাড়তে পারে। আর সংঘাত প্রশমিত হলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে বাজারেও স্বস্তি ফিরতে পারে। তাই আগামী কয়েক দিন ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারের গতিবিধির দিকে নজর থাকবে।