হরমুজ প্রণালি বন্ধ-খোলার দোলাচল: তেলের দাম ও বিশ্ববাজারে এর প্রভাব কী?

হরমুজ প্রণালি, তেলের ট্যাংকার, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের প্রভাব
হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল, তেলের সরবরাহ
এবং বিশ্ববাজারে দামের সম্ভাব্য প্রভাব।

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হরমুজ প্রণালি বন্ধ-খোলার দোলাচল

হরমুজ প্রণালি বন্ধ-খোলার দোলাচল ঘিরে এখন বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বরের বাজারচিত্রে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ১০৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল। এর পেছনে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আশা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও জাহাজ চলাচলে বাধার আশঙ্কা কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকেরা হরমুজ পুনরায় খোলার সঙ্গে যুক্ত একটি ধাপে ধাপে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে তারা প্রণালি খুলতে প্রস্তুত।

হরমুজ প্রণালি কোথায় অবস্থিত?

হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এই জলপথের ভৌগোলিক অবস্থানই একে জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় উৎপাদক দেশগুলোর কাছ থেকে তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে নিতে হরমুজ একটি প্রধান পথ।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ দিয়ে গেছে। এই পরিমাণ বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। ফলে হরমুজে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালি কতটা সরু?

সবচেয়ে সরু অংশে হরমুজের প্রস্থ প্রায় ২১ মাইল। কিন্তু নির্ধারিত নৌপথ আরও সংকীর্ণ প্রতিটি দিকের চলাচলের জন্য প্রায় ২ মাইল করে পথ এবং মাঝখানে একটি বাফার এলাকা রয়েছে। এ কারণে এটি একটি কৌশলগত জলপথ বা জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু পাইপলাইন বিকল্প পথ দিতে পারে, কিন্তু তাদের সক্ষমতা হরমুজের সম্পূর্ণ প্রবাহ প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

কোন দেশের নিয়ন্ত্রণে হরমুজ?

হরমুজ ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এলাকায়। ইরান প্রণালির উত্তর উপকূলের অংশ এবং ওমান দক্ষিণ উপকূলের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এটি একক দেশের দখলে থাকা একটি সাধারণ নদীপথের মতো নয়। কিন্তু বর্তমান সংঘাতে ইরানের সামরিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত হরমুজের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলে বড় প্রভাব ফেলছে। ইরানই এখন শর্তসাপেক্ষে প্রণালি খোলার প্রস্তাব দিয়েছে।

হরমুজ দিয়ে এখন কত জাহাজ চলছে?

স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমান চলাচল অনেক কম। রয়টার্সের ২২ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছিল। সংঘাতের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। একই সময় দুটি জাহাজে হামলার ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে। এসব তথ্য দেখায়, পুরোপুরি আইনি বা ভৌগোলিক অর্থে জলপথ বন্ধ না থাকলেও বাণিজ্যিক চলাচল ভয়াবহভাবে কমে গেছে।

তেলের দাম বাড়ার কারণ কী?

তেলের বাজার মূলত ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখায়। পরিবহন সময়, বীমা ও নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে। উপসাগরীয় উৎপাদকরা কিছু তেল বিকল্প পদ্ধতিতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও এতে খরচ বেশি। রয়টার্সের বিশ্লেষণে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর বাড়ার কথা বলা হয়েছে, যা সরবরাহ সচল রাখলেও বিশ্ববাজারে খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

২৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট প্রায় ১০৫ ডলারের কাছে ছিল। বৃহস্পতিবারের বড় উত্থানের পর শুক্রবার কিছুটা কমলেও বাজার অস্থির ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার আশায় দাম কিছুটা নরম হয়েছে, আবার সৌদি আরবের দিকে হুথি হামলার মতো ঘটনাগুলো নতুন সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি করছে।

এশিয়ার জন্য কেন বড় উদ্বেগ?

হরমুজের জ্বালানি প্রবাহের বড় অংশ এশিয়ায় যায়। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ৮৯ শতাংশ এশিয়ার বাজারে পৌঁছেছে। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে। একই সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি হরমুজ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশের বেশি। তাই দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে এশিয়ায় জ্বালানির প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি বাধা হলে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেল, পেট্রল, বিমান জ্বালানি, এলএনজি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বাড়লে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। তবে কতটা প্রভাব হবে তা নির্ভর করবে বিকল্প সরবরাহ, মজুত, পাইপলাইন ব্যবহার এবং সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজের পাশের দেশ নয়, কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দামের প্রভাব বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে। তেলের আমদানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার হরমুজ দ্রুত স্বাভাবিক হলে তেলের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আমদানি চুক্তি, মজুত এবং আন্তর্জাতিক মূল্য কতদিন উঁচু থাকে তার ওপর।

হরমুজ খুললে কী হবে, বন্ধ থাকলে কী হবে?

হরমুজ স্বাভাবিকভাবে খুললে ট্যাংকার চলাচল বাড়বে, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমবে এবং বাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে। বিপরীতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল আরও কমতে পারে, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং তেলের বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই বর্তমানে হরমুজ নিয়ে প্রতিটি কূটনৈতিক ও সামরিক খবর সরাসরি জ্বালানি বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে।

সারসংক্ষেপ

হরমুজ প্রণালি ভৌগোলিকভাবে সংকীর্ণ হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব বিশাল। ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক তেল প্রবাহ, বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের বড় অংশ, সীমিত জাহাজ চলাচল এবং প্রায় ১০৫ ডলারের ব্রেন্ট সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় সমঝোতার অগ্রগতি হলে বাজারে স্বস্তি আসতে পারে; আবার সংঘাত বাড়লে সরবরাহ ঝুঁকি ও দাম দুটিই বাড়তে পারে।


তথ্যসূত্র-

Reuters — যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ধাপে ধাপে সমঝোতা ও হরমুজ পুনরায় খোলার আলোচনা

Reuters — হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া

U.S. Energy Information Administration — হরমুজের তেল ও এলএনজি প্রবাহ

U.S. Energy Information Administration — হরমুজের প্রস্থ ও বিকল্প পরিবহনপথ

The Economic Times — ২৫ সেপ্টেম্বরের তেলের বাজার ও হরমুজ পরিস্থিতি


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে


সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন


Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন