বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে, বাংলাদেশে কেন বাড়ল জ্বালানির দাম?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে তেলের দাম বৃদ্ধি।

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে

বিশ্ববাজারে Global Oil Price আবারও ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৯৯.১৮ ডলারে নেমে আসে। সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার সম্ভাবনা তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে।

কিন্তু এর মধ্যেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারে ২০ টাকা করে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে, তাহলে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো কেন?

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কত?

বাংলাদেশ সরকার ২০ সেপ্টেম্বর রাতে নতুন জ্বালানি মূল্য ঘোষণা করে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

নতুন দামে ডিজেলের প্রতি লিটারের মূল্য ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান তরল জ্বালানির ক্ষেত্রেই লিটারে ২০ টাকা করে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে দাম কেন বাড়ল?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Global Oil Price এবং বাংলাদেশের খুচরা জ্বালানি মূল্য একই সময়ে একই হারে পরিবর্তিত হয় না।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ওই দিনের আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম বিবেচনা করা হয় না। আমদানি করা জ্বালানির প্রকৃত ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা ব্যয়, পরিবহন খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, সরকারি ভর্তুকি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনায় আসে

বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে আগের দাম ধরে রাখার কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানও বড় কারণ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট সময়কালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও কয়েক মাস দেশের বাজারে আগের দাম ধরে রাখার কারণে এই চাপ তৈরি হয়।

সরকার আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

তেলের দাম আজ কমলেই কি বাংলাদেশে দাম কমবে?

না, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

২৩ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯৯.১৮ ডলারে নেমেছে। এর আগের দিনও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছিল। বাজারে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরান কূটনৈতিক আলোচনার আশাবাদ এর অন্যতম কারণ।

তবে বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের সময় যে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, তা সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় না। ফলে এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর কমার ভিত্তিতে দেশের খুচরা জ্বালানি মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কী প্রভাব পড়তে পারে?

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান, নৌপরিবহন এবং কৃষি যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে।

এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারের বিভিন্ন পণ্যের দামেও পড়তে পারে। কারণ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বাজারে পণ্য পরিবহন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সরবরাহ এবং শিল্পকারখানার পরিচালন সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ।

ইতোমধ্যে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোও অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে কিছু সেবার চার্জ বাড়িয়েছে।

সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কতটা বাড়তে পারে?

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে পরিবহন ব্যবহারকারী, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর।

বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল বাংলাদেশে পরিবহন, কৃষি ও শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের মূল্য বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনের খরচ নয়, পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও আশঙ্কা করা হয়েছে, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

সামনে তেলের বাজার কোন দিকে যাবে?

আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার অগ্রগতি, সবকিছুই তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।

২৩ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামলেও বাজারের এই পরিস্থিতি স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আবার সংঘাত বাড়লে তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

শেষ কথা

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামার খবর বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও, এর অর্থ এই নয় যে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে। বাংলাদেশে জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদরের পাশাপাশি আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও বীমা ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ভর্তুকি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক অবস্থার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমে এবং আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশেও ভবিষ্যৎ মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেটি নির্ভর করবে সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি ও সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং অন্যান্য প্রকাশিত প্রতিবেদন।


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে


সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন


Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন