প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
Far-Right Europe Politics জার্মানিতে AfD-এর বড় জয়, কোন পথে ইউরোপের রাজনীতি?
Far-Right Europe Politics আবারও ইউরোপের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা AfD-এর বড় জয় ইউরোপজুড়ে নতুন রাজনৈতিক হিসাব তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের এই ফল শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল নয়;বরং অভিবাসন,জীবনযাত্রার ব্যয়,বেকারত্ব,জাতীয় পরিচয় ও প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অসন্তোষ—এসব প্রশ্নে ইউরোপীয় ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে স্যাক্সনি-আনহাল্টে AfD প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং ৮৩ আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন দখল করেছে। ফলে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জার্মানির রাজনীতিতে অভূতপূর্ব শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টে AfD-এর ঐতিহাসিক সাফল্য
জার্মানির ইতিহাসের কারণে দেশটির রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান বরাবরই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। নাৎসি শাসনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী চরমপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে।
এই নীতিকে অনেকে ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থাৎ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো AfD-এর সঙ্গে সরকার গঠন বা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সহযোগিতা এড়িয়ে চলেছে। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সেই নীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী,AfD এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরিতে রক্ষণশীল রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস AfD-এর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্ব বড় কারণ
AfD-এর উত্থানের পেছনে শুধু আদর্শগত রাজনীতি কাজ করছে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। মূল্যস্ফীতি,কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা,অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জার্মানির পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ—এমন ধারণা তৈরি হলে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ভোটারদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
AfD এই অসন্তোষকে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার করেছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ,জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইউরোপীয় নীতির সমালোচনার মতো বিষয় দলটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির বিস্তার
জার্মানির ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না ইউরোপের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফ্রান্স, ইতালি,যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছে।
ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির জনপ্রিয়তা বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ভোটাভুটি বিশ্লেষণে জর্ডান বারদেলা ও মারিন লে পেনকে প্রথম দফার দৌড়ে শক্ত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
তবে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মধ্যপন্থী ও বামপন্থী দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকে, তাহলে ডানপন্থী প্রার্থীরা দ্বিতীয় দফায় তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারেন। আবার মধ্যপন্থী দলগুলো যদি একটি শক্তিশালী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়,তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
ইতালিতে মেলোনির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দল এখনও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু তাঁর ডানপন্থী রাজনীতির ভেতরেই নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপে রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন Futuro Nazionale দল ৭ শতাংশের বেশি সমর্থন নিয়ে ফরজা ইতালিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। একই জরিপে মেলোনির Brothers of Italy প্রায় ২৬.৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে।
এর অর্থ হলো,ইতালিতে ডানপন্থী রাজনীতির জনপ্রিয়তা থাকলেও সেই ভোট একক দলের হাতে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং একই রাজনৈতিক পরিসরে একাধিক ডানপন্থী শক্তির প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে জোটের হিসাব আরও জটিল করতে পারে।
যুক্তরাজ্যে Farage-এর উত্থান ও নতুন সংকট
যুক্তরাজ্যেও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান ইউরোপের বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন Reform UK সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন অর্জন করলেও দলটি এখন অভ্যন্তরীণ ও আর্থিক বিতর্কের মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দলটির অর্থায়ন নিয়ে অভিযোগের পর দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্তের চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে ডানদিক থেকে Rupert Lowe-এর Restore Britain-ও Reform UK-এর ভোটব্যাংকে চাপ তৈরি করছে। ফলে যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী ভোট এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
কট্টর ডানপন্থীদের নিয়ে ইউরোপে বিভক্ত মত
ইউরোপে ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান নিয়ে সমাজে দুটি বড় মত তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ মনে করে,এসব দল ক্ষমতায় গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা,সংখ্যালঘু অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্য পক্ষের যুক্তি হলো,প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা, অভিবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে ভোটারদের একটি অংশ পরিবর্তনের জন্য কট্টর রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনের ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
হাঙ্গেরির অভিজ্ঞতা কি সতর্কবার্তা?
ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির আলোচনায় হাঙ্গেরির অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর ভিক্তর অরবানের রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এতে ইউরোপের মধ্যপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদে ডানপন্থী সরকারগুলোকেও ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
অর্থাৎ ডানপন্থী দল জনপ্রিয়তা পেলেই তারা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সরকারের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা,দুর্নীতি,প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক নীতি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে ইউরোপের রাজনীতিতে কী হতে পারে?
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল ইউরোপের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত। তবে এটিকে সরাসরি পুরো মহাদেশে কট্টর ডানপন্থীদের নিশ্চিত বিজয়ের পূর্বাভাস বলা এখনই সম্ভব নয়।
কারণ প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামো,নির্বাচন পদ্ধতি,অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলগুলোর জোটের সমীকরণ আলাদা। কোথাও ডানপন্থীরা এককভাবে শক্তিশালী হচ্ছে,আবার কোথাও তাদের ভোট একাধিক দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
তারপরও একটি বিষয় স্পষ্ট—ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়,কর্মসংস্থান,নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের মতো প্রশ্নে আরও কার্যকর রাজনৈতিক উত্তর দিতে হবে।
জার্মানিতে AfD-এর বড় জয় সেই চাপকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন,ইতালিতে ডানপন্থী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাজ্যে Reform UK-এর উত্থান—সব মিলিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতি নতুন এক পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
শেষ পর্যন্ত Far-Right Europe Politics কোন দিকে যাবে,তা নির্ভর করবে ভোটারদের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা, মূলধারার দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশল এবং ডানপন্থী দলগুলো ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে কতটা কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতি করতে পারে তার ওপর। জার্মানির সাম্প্রতিক নির্বাচন তাই শুধু একটি আঞ্চলিক নির্বাচনের ফল নয়;এটি ইউরোপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
