ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে: একদিনে রেকর্ড ২,১৫৮ হাসপাতালে,আরও ৬ মৃত্যু

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, একদিনে ২১৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ৬ মৃত্যু
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে: ২,১৫৮ হাসপাতালে, আরও ৬ মৃত্যু

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৬৯৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭৫৫ জন রোগী চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বিশেষভাবে বেড়েছে,ফলে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপরও বাড়ছে চাপ।

ডেঙ্গুর কারণ কী?

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ,যা মূলত আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত ঘরবাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টব,পরিত্যক্ত পাত্র,প্লাস্টিকের বোতল,ডাবের খোসা,নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি কিংবা অন্যান্য ছোট পানির আধার এ মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।

ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী?

ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ উচ্চ জ্বর। এর সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা,চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা,অস্থিসন্ধিতে ব্যথা,বমি বমি ভাব,বমি,দুর্বলতা এবং কখনও ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় সাধারণ জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণের মিল থাকায় রোগী বিষয়টি গুরুত্ব না-ও দিতে পারেন।

বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগী ভালো হয়ে গেছেন এমন ধারণা করা ঠিক নয়। এই সময়েই কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের কোন সতর্কীকরণ লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?

তীব্র পেটব্যথা,বারবার বমি,নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া,বমি বা পায়খানায় রক্ত,অতিরিক্ত দুর্বলতা,অস্থিরতা,দ্রুত শ্বাস নেওয়া,প্রচণ্ড তৃষ্ণা,ত্বক ফ্যাকাশে বা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কীকরণ লক্ষণ হতে পারে।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর যদি নতুন করে এসব উপসর্গ দেখা দেয়তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গু টেস্ট কখন করা হয়?

ডেঙ্গু নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা হয়। রোগের কোন পর্যায়ে কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে তা রোগীর উপসর্গ,জ্বরের সময়কাল এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। তাই নিজের ইচ্ছায় শুধু একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা করিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণ ও চিকিৎসা

শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু বিশেষভাবে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জ্বর,খাবারে অনীহা,বমি,অতিরিক্ত দুর্বলতা,পেটব্যথা,অস্বাভাবিক কান্না বা অস্থিরতা এবং রক্তপাতের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

শিশুর ডেঙ্গু হলে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা চালানো গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর অবস্থা খারাপ হলে ঘরে বসে চিকিৎসা না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া উচিত।

ডেঙ্গুর প্রতিকার ও চিকিৎসা কী?

ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা,পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করা এবং গুরুতর অবস্থার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া।

জ্বর বা ব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ব্যথানাশক ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকার

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ভেতর ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফুলের টব,বালতি,বোতল,পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য পানির আধার পরিষ্কার রাখতে হবে।

দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, শরীরের অধিকাংশ অংশ ঢেকে রাখা পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি,কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো মশা পরবর্তীতে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।

সবার সচেতনতাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু হাসপাতাল বা সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

এক দিনে রেকর্ড ২ হাজার ১৫৮ জন ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি এবং আরও ৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। তাই জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া,সতর্কীকরণ লক্ষণ সম্পর্কে জানা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে


সাইবার নিরাপত্তা: Facebook, WhatsApp ও YouTube অ্যাকাউন্ট কীভাবে নিরাপদ রাখবেন


Deepfake Technology কী? AI দিয়ে তৈরি নকল ছবি ও ভিডিও কীভাবে চিনবেন