![]() |
| বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির মধ্যে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির দৃশ্য। |
নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশে হাম: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার অভিযান শুরু
সর্বশেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু এবং ৯৮০টি নতুন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই দিনে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির সর্বশেষ চিত্র
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৬ সেপ্টেম্বরের দৈনিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের মতো উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা ১,০৮৭-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে সন্দেহভাজন মৃত্যু ৯৮৬টি এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত মৃত্যু ১০১টি। একই ২৪ ঘণ্টায় ৯৮০টি নতুন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে।
হাম রোগীর সংখ্যা কত?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একই আপডেট অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮১৩। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৯৯। এই সময়ে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৫৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭৬ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; হাসপাতালগুলোর ওপরও এর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
৩৪ লাখ শিশুর জন্য নতুন টিকাদান অভিযান
হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ২৬ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী নতুন বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু করেছে। এই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যেসব শিশু আগের কর্মসূচিতে টিকা পায়নি বা বাদ পড়ে গেছে, তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়াই এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য। কর্মসূচি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মহাখালীর করাইল টি অ্যান্ড টি মাঠে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
আগের কর্মসূচিতে কত শিশু টিকা পেয়েছে?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন ধাপে পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু টিকা পেয়েছে। নতুন কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি এই সময়ে ৬ মাস বয়স পূর্ণ করা উপযুক্ত শিশুদেরও চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারের হাতে হাম-রুবেলা টিকার মজুতও রয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
কেন নতুন করে টিকাদান অভিযান প্রয়োজন হলো?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপ্রিলের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২৪–২০২৫ সময়ে হাম-রুবেলা টিকার মজুত ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা কর্মসূচির অনুপস্থিতির কারণে টিকা না পাওয়া বা পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছিল, দেশের ৮ বিভাগের ৫৮টি জেলায় সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই মোট রিপোর্ট হওয়া রোগীর বড় অংশ ছিল।
হাম রোগের লক্ষণ কী?
হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। শিশুর ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে খাওয়ার অনীহা, দুর্বলতা বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে শরীরে ফুসকুড়ি হলেই সেটি হাম এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ অন্য সংক্রমণেও একই ধরনের লক্ষণ হতে পারে। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাম রোগের প্রতিকার কী?
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং এর ক্ষেত্রে চিকিৎসা সাধারণত উপসর্গ ও জটিলতা নিয়ন্ত্রণের দিকে কেন্দ্রীভূত থাকে। পর্যাপ্ত তরল, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর অবস্থা খারাপ হলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে। হামের গুরুতর জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হাম রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত হাম-সমৃদ্ধ টিকা গ্রহণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চ টিকা কভারেজ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের জন্য সম্পূরক বা ক্যাচ-আপ কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা যায়।
শিশুদের হাম হলে কী খেতে হবে?
শিশুদের হাম হলে কী খেতে হবে এ প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া। বয়স উপযোগী স্বাভাবিক খাবার, দুধ বা অন্যান্য তরল শিশুর সহনশীলতা অনুযায়ী দেওয়া যেতে পারে। খেতে না পারা, বারবার বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট খাবার হাম সারিয়ে দেয় এমন ধারণার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
বড়দের হাম হলে কী খেতে হবে?
বড়দের হাম হলেও পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গের জন্য ওষুধ নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পানিশূন্যতা বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
বাচ্চাদের হাম হলে করণীয়
বাচ্চাদের হাম হলে করণীয় হলো শিশুকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্য শিশুদের সংস্পর্শে না নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন নেওয়া। পরিবারের অন্য শিশুদের টিকাদান সম্পূর্ণ হয়েছে কি না সেটিও যাচাই করা দরকার। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় অসুস্থ শিশুকে নিয়ে জনসমাগমে যাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত।
হাম হলে কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, খুব বেশি দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে গেলে, পানি বা খাবার রাখতে না পারলে, বারবার বমি হলে, পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে, খিঁচুনি হলে বা অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
হাম রোগের ছবি দেখে কি রোগ নির্ণয় করা যায়?
হাম রোগের ছবি দেখে নিজে রোগ নির্ণয় করা নিরাপদ নয়। ফুসকুড়ির ধরন, জ্বরের সময়কাল, অন্যান্য উপসর্গ এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন। তাই অনলাইনে হাম রোগের ছবি দেখে শিশুকে নিজে থেকে হাম আক্রান্ত ঘোষণা করা বা ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করণীয়
অভিভাবকদের প্রথম কাজ হলো শিশুর টিকাদান কার্ড পরীক্ষা করা। নির্ধারিত হাম-রুবেলা টিকা নেওয়া হয়েছে কি না নিশ্চিত না হলে স্থানীয় টিকাদান কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। নতুন কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী বাদ পড়া শিশুদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। তাই যোগ্য কোনো শিশু যেন কর্মসূচির বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সচেতন থাকা জরুরি।
হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি যা জরুরি
শুধু টিকা নয়, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, আক্রান্ত শিশুকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া, অপুষ্টি মোকাবিলা, টিকাদানের বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো—সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হাম প্রতিরোধে শক্তিশালী নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
আজকের নতুন কর্মসূচির গুরুত্ব
২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া নতুন কর্মসূচি ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার মাধ্যমে আগের টিকাদান ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই অভিযানে মাঠপর্যায়ে বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করা এবং তাদের টিকা দেওয়াই মূল লক্ষ্য। হাম পরিস্থিতির বর্তমান পরিসংখ্যানের কারণে কর্মসূচিটি সময়মতো এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির সর্বশেষ পরিসংখ্যান উদ্বেগের কারণ হলেও নতুন টিকাদান কর্মসূচি বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষার আওতায় আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। অভিভাবকদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর টিকাদান অবস্থা যাচাই করা, হামসদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা।
তথ্যসূত্র-
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর — ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হাম পরিস্থিতি বুলেটিন
The Business Standard : ২৪ ঘণ্টায় ৩ শিশুর মৃত্যু ও ৯৮০ নতুন কেস
The Daily Star : ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে জাতীয় টিকাদান অভিযান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা — বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম পরিস্থিতি ও টিকাদান মূল্যায়ন
