বাংলাদেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কেন? মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কতটা

বাংলাদেশের এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কেন? মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব

BANGLADESH GAS CRISIS 2026 এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়;এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন,শিল্পকারখানা,পোশাক খাত,ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

সাম্প্রতিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অবশ্য কিছুটা উন্নতির কথাও এসেছে। চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ঢাকা,গাজীপুর,নারায়ণগঞ্জ,মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর অনেক শিল্পকারখানা এখনও অনুমোদিত চাপের তুলনায় কম গ্যাস পাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশের জালানী সংকটের সম্পর্ক কী?

বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থায় দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ওই অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।

রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর ঘিরে বাণিজ্যিক পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রায় ৩০ ডলার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে উঠে গেছে। যুদ্ধের আগে দাম ছিল প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো প্রয়োজনীয় এলএনজি কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

এলএনজি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়ছে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালাতে সমস্যায় পড়ে।

রয়টার্স জানিয়েছে,বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। কাতার থেকে সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এর প্রভাব বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর পড়ছে। কোথাও লোডশেডিং বাড়ছে,আবার কোথাও শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো পর্যাপ্ত চাপ না পেলে বয়লার, চুল্লি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোতে অনুমোদিত ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের বিপরীতে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস চাপ পাওয়ার তথ্য এসেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে পোশাক খাতের ওপরও বড় ধরনের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। একটি শিল্পগোষ্ঠীর জরিপ অনুযায়ী,গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ করেছে এবং কিছু কারখানা ক্রেতার অর্ডার কমে যাওয়ার মুখে পড়েছে।

মানুষের ভোগান্তি কীভাবে বাড়ছে?

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরাও কম চাপের গ্যাসের সমস্যায় পড়ছেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে রাজধানীতে পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা কিনলেও লোডশেডিংয়ের কারণে রান্না করতে সমস্যায় পড়ার কথা উঠে এসেছে।

অর্থাৎ একটি জ্বালানি সংকট অন্য একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গ্যাস না থাকলে মানুষ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন;আবার বিদ্যুৎ না থাকলে সেই বিকল্পও অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

সংকট কাটাতে সরকারের উদ্যোগ কী?

সরকার একদিকে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে তাৎক্ষণিক ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

টিবিএস জানিয়েছে,তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিনটি নতুন কূপ থেকে আগামী ছয় মাসে দৈনিক অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার দ্রুত জ্বালানি আমদানির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে।

ভবিষ্যত কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না;আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও এর ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

নতুন এলএনজি কার্গো আসায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,সব এলাকায় পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

তাই স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো দুই দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তাই কেবল একটি সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত,আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার,দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।


Follow us on Facebook


আরো পড়ুন-

মাইক্রোপ্লাস্টিক: কীভাবে শরীরে পৌঁছায় এবং বিজ্ঞান কী বলছে



সূত্র: REUTERS, TBS ও প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং PETROBANGLA-এর তথ্য।