বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচী
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিশেষ টিকাদান
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে হাম সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতেও তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগের টিকাদান কর্মসূচির পর এবার দ্বিতীয় দফায় বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই বিশেষ কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি কেন উদ্বেগজনক
সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। Reuters-এর ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬ থেকে দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার ৮০০ রোগীর পরীক্ষাগারে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ৯৯৯ জনের মৃত্যুর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাবকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও টিকাদানে তৈরি হওয়া ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি
২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় দফায় টিকাদান
সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় সরকার আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় দফায় হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে।
মন্ত্রী জানান, এর আগে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি এবং পরবর্তী মপ-আপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। সেই কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে হাম টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে নতুন কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাদ পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার
নতুন কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হবে আগের টিকাদান কার্যক্রমে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা। বিশেষ করে যেসব শিশু আগের কর্মসূচিতে টিকা পায়নি, নিয়মিত টিকাদান থেকে পিছিয়ে রয়েছে কিংবা দুর্গম এলাকায় বসবাস করে—তাদের টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। কারণ শুধু একটি জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। নিয়মিত টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি।
বাদ পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার
টিকা সরবরাহ ও সরকারি প্রস্তুতি
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচির জন্য অধিকাংশ টিকা ইতোমধ্যে UNICEF-এর মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এর আগে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংসদে দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে টিকা ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিভিন্ন সময়ে বিঘ্নের বিষয় উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ও চলতি বছরের এপ্রিল থেকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির তথ্য জানিয়েছিল। ওই কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে সুরক্ষার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।
হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদানের পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা কাটানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
হামের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষার জন্য নিয়মিত টিকার পূর্ণ ডোজ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা থেকে বাদ পড়ে গেলে অভিভাবকদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় জেনে নেওয়া উচিত।
শিশুর জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। হাম সন্দেহ হলে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা সংক্রমণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করা, টিকাদান কেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য নেওয়া এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
হাম ও ডেঙ্গুর দ্বৈত চাপ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বর্তমানে শুধু হাম নয়, ডেঙ্গুর চাপও রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। Reuters জানিয়েছে, চলতি বছর সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪২ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি এবং ১১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
একই সময়ে হাম রোগীর চাপ বাড়ায় শিশুদের চিকিৎসা এবং হাসপাতালের বেড ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ওষুধ-সরঞ্জাম, আইসোলেশন সুবিধা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
২৫ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় দফার টিকাদান কর্মসূচি হাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে টিকা দ্রুত ও সঠিকভাবে লক্ষ্যভুক্ত শিশুদের কাছে পৌঁছানো, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং পরবর্তীতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করার ওপর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া শুধু জরুরি ক্যাম্পেইনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদানে কোনো ধরনের ঘাটতি যাতে ভবিষ্যতে আবার তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি বর্তমানে উদ্বেগজনক হলেও কার্যকর টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাই সরকারের নতুন কর্মসূচির পাশাপাশি অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে শিশুদের সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আপনার নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। তাই আমাকে ক্ষমা করুন; আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই।
বাংলা অর্থ: হে চিরঞ্জীব, হে সবকিছুর ধারক! আপনার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য চাই। আমার সব বিষয় সংশোধন করে দিন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই—এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।